বাছুর পালন

নবজাতক বাছুরের সঠিক যত্ন, শালদুধের গুরুত্ব এবং নাভি পচা রোগের চিকিৎসা

২ আগস্ট, ২০২৬ ৫ মিনিট পড়ার সময়

একটি খামারের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে সুস্থ ও নিখুঁত বাছুরের ওপর। গাভীর প্রসবের পর নবজাতক বাছুরের যদি সঠিক যত্ন নেওয়া না হয়, তবে মৃত্যুর ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। বাংলাদেশের খামারিদের জন্য নবজাতক বাছুরের সুরক্ষায় প্রারম্ভিক পরিচর্যা, শালদুধ (Colostrum) খাওয়ানো এবং নাভি পচা (Navel Ill) রোগের প্রতিরোধ ও চিকিৎসা জানা অত্যন্ত জরুরি।

১. প্রসবের পর নবজাতক বাছুরের জরুরি প্রথম যত্ন

গাভী বাছুর প্রসব করার পরপরই খামারিকে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে নিচের পদক্ষেপগুলো নিতে হবে:

  • শ্বাস-প্রশ্বাস নিশ্চিত করা: বাছুর ভূমিষ্ঠ হওয়ার সাথে সাথে মুখ ও নাকের ভেতরে থাকা শ্লেষ্মা বা মিউকাস পরিষ্কার করে দিতে হবে। প্রয়োজনে বাছুরকে পেছনের দুই পা ধরে উল্টো করে ঝুলিয়ে হালকা ঝাঁকুনি দেওয়া যেতে পারে যেন ফুসফুস থেকে জলীয় অংশ বের হয়ে যায়।
  • শরীর শুকানো: মা গাভীকে বাছুর চাটতে দিন। এটি বাছুরের রক্ত সঞ্চালন বাড়ায় এবং শরীর দ্রুত শুকাতে সাহায্য করে। মা গাভী না চাটলে পরিষ্কার ও শুকনো চট বা তোয়ালে দিয়ে শরীর মুছে দিন।
  • নাভি কাটা ও ড্রেসিং: পেট থেকে প্রায় ২-৩ ইঞ্চি দূরে পরিষ্কার ও জীবাণুমুক্ত সুতা দিয়ে নাভি বেঁধে দিন। এরপর একটি নতুন ব্লেড দিয়ে বাঁধনের নিচ থেকে কেটে ফেলুন। কাটা স্থানে তাৎক্ষণিকভাবে ৭% পোভিডন-আইওডিন (Povidone-iodine) দ্রবণ বা টিংচার আইওডিন লাগান।

২. প্রথম শালদুধ (Colostrum) খাওয়ানোর চরম গুরুত্ব

নবজাতক বাছুরের জন্য শালদুধ কেবল খাদ্য নয়, এটি বাছুরের জীবন রক্ষাকারী প্রথম টিকা। গাভী প্রসবের পর প্রথম ৩-৫ দিন যে ঘন, হলুদ রঙের দুধ দেয় তাকে শালদুধ বা কলস্ট্রাম বলে।

  • রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি: মানুষের মতো বাছুর মায়ের পেট থেকে ইমিউনিটি বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নিয়ে জন্মায় না। শালদুধে থাকা ‘ইমিউনোগ্লোবুলিন’ (Immunoglobulin) বাছুরকে বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাসের আক্রমণ থেকে রক্ষা করে।
  • সময়সীমা: বাছুর জন্মের ১ থেকে ২ ঘণ্টার মধ্যে শালদুধ খাওয়ানো সবচেয়ে উত্তম। জন্মের ১২ ঘণ্টা পর অন্ত্রের অ্যান্টিবডি শোষণ করার ক্ষমতা ৫০% কমে যায় এবং ২৪ ঘণ্টা পর তা প্রায় বন্ধ হয়ে যায়।
  • পরিমাণ: বাছুরের শরীরের ওজনের প্রায় ১০% পরিমাণ শালদুধ দৈনিক দিতে হবে। যেমন— বাছুরের ওজন ২০ কেজি হলে দিনে ২ লিটার শালদুধ ৩-৪ বারে ভাগ করে খাওয়াতে হবে।
  • পেট পরিষ্কার করা: শালদুধ হালকা জোলাপ হিসেবে কাজ করে বাছুরের পেটের ভেতরের প্রথম মল (Meconium) বের করে দিতে সাহায্য করে।

মনে রাখবেন: প্রসবের প্রথম ৬ ঘণ্টার মধ্যে বাছুরকে পর্যাপ্ত শালদুধ না খাওয়ালে বাছুর স্থায়ীভাবে দুর্বল হয়ে পড়তে পারে এবং নাভি পচা বা ডায়রিয়া রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি ৯০% বেড়ে যায়।

৩. নাভি পচা রোগ (Navel Ill) কি এবং কেন হয়?

নবজাতক বাছুরের নাভি কাটা অংশ দিয়ে স্যাঁতসেঁতে মেঝের ব্যাকটেরিয়া সহজেই শরীরের ভেতরে প্রবেশ করতে পারে। নাভি সঠিকভাবে কাটা ও জীবাণুমুক্ত না করলে সেখানে সংক্রমণ সৃষ্টি হয়ে পচন ধরে, যাকে 'নাভি পচা' বা Navel Ill বলা হয়।

৪. নাভি পচা রোগের লক্ষণসমূহ

  • নাভির চারপাশ ফুলে যাওয়া, লাল হওয়া এবং টাটালে বাছুর যন্ত্রণায় ছটফট করা।
  • নাভি থেকে দুর্গন্ধযুক্ত পুঁজ বা তরল রক্ত মিশ্রিত পানি নির্গত হওয়া।
  • বাছুরের শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়া (জ্বর আসা)।
  • বাছুর দুধ খেতে অনীহা প্রকাশ করা এবং অলসভাবে শুয়ে থাকা।
  • সংক্রমণ বেশি ছড়িয়ে পড়লে বাছুরের পায়ের জোড়ায় জোড়ায় ফোলা ও ব্যথা হতে পারে (Joint Ill)।

৫. নাভি পচা রোগের চিকিৎসা ও প্রতিকার

রোগের লক্ষণ দেখা মাত্রই দেরি না করে ব্যবস্থা নিতে হবে:

  • প্রাথমিক ঘরোয়া চিকিৎসা: নাভির চারপাশ হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড বা পটাশ পানি দিয়ে ভালোভাবে ধুয়ে পুঁজ পরিষ্কার করে নিতে হবে। এরপর নিয়মিত পোভিডন-আইওডিন তুলা দিয়ে লাগাতে হবে।
  • অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ: পচন ধরে গেলে রেজিস্টার্ড ভেটেরিনারি সার্জন বা পশু চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পেনিসিলিন বা অক্সিটেট্রাসাইক্লিন গ্রুপের ইনজেকশন বা অ্যান্টিবায়োটিক স্প্রে ব্যবহার করতে হবে।
  • ব্যাথা ও জ্বর নিরোধক: পশুর তীব্র ব্যথা ও জ্বর থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শে ব্যথানাশক ওষুধ দিতে হবে।

খামারিদের জন্য প্রতিরোধমূলক পরামর্শ

প্রতিকারের চে���ে প্রতিরোধ সর্বদাই উত্তম। গাভীর প্রসবের স্থান বা শেড সবসময় শুকনো, পরিষ্কার ও জীবাণুমুক্ত রাখুন। বাছুর জন্মের সাথে সাথে নাভিতে আইওডিন ব্যবহার করুন এবং সঠিক সময়ে পর্যাপ্ত শালদুধ নিশ্চিত করুন। এতে আপনার খামারের প্রতিটি বাছুর বড় হবে সুস্থ ও সবলভাবে।